হাওজা নিউজ এজেন্সি: ইমামে যামানা মুহাম্মাদ আল-মাহদী (আ.ফা.) সম্পর্কিত জ্ঞান ও শিক্ষার প্রসারের উদ্দেশ্যে “আদর্শ সমাজের দিকে” শীর্ষক ধারাবাহিক মাহদাভিয়াত আলোচনার এই পর্বটি সম্মানিত পাঠকদের জন্য উপস্থাপন করা হলো:
গণমাধ্যমের প্রভাব ও আধুনিক বিশ্ব
গণমাধ্যম আধুনিক যুগের সবচেয়ে প্রভাবশালী উপকরণগুলোর একটি। এটি কেবল ব্যক্তির চিন্তা, অনুভূতি ও আচরণের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে না, বরং সমাজের সামগ্রিক সংস্কৃতি, নৈতিক কাঠামো, সামাজিক হুকুম-আহকাম এবং সেইসব মানদণ্ড ও সূচক নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যেগুলোর ভিত্তিতে মানুষ তার আচরণগত নীতি গঠন করে।
মুক্তিদাতার ধারণা ও মানবজাতির ঐক্যবদ্ধ বিশ্বাস
মুক্তিদাতার প্রতি বিশ্বাস এমন একটি বিষয়, যা ইব্রাহিমি ও অ-ইব্রাহিমি উভয় ধর্মীয় ধারার মধ্যেই একটি সাধারণ ও সর্বসম্মত বিষয় হিসেবে বিদ্যমান। ইতিহাস জুড়ে এমন বহু ভয়াবহ সংকট, দুর্যোগ ও অস্তিত্ব-হুমকি দেখা গেছে, যা মানবজাতির অস্তিত্বকেই বিপন্ন করেছে এবং যেখানে মানুষ নিজস্ব শক্তি দিয়ে প্রতিরোধ করতে অক্ষম ছিল। এ কারণেই বিভিন্ন ধর্মে “মুক্তিদাতা” ধারণার জন্ম হয়েছে।
ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, জুলুম-অবিচারের অবসান এবং মানবতার মুক্তির সঙ্গে মুক্তিদাতার আগমনকে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত করে দেখা হয়। ফলে বিভিন্ন ধর্ম ও বিশ্বাসের মানুষ সবসময়ই নিজ নিজ বিশ্বাস অনুযায়ী মুক্তিদাতার আগমনের প্রত্যাশা করে থাকে।
স্বাভাবিকভাবেই মুক্তিদাতার প্রতি আকাঙ্ক্ষা ও আগ্রহ বিভিন্ন কারণের ওপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী একটি উপাদান হলো গণমাধ্যম, যা মানুষের এই আকাঙ্ক্ষা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
গণমাধ্যম আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রভাবকগুলোর একটি। এটি শুধু সরাসরি মানুষের ওপর প্রভাব ফেলে না, বরং মানুষের সংস্কৃতি, সামাজিক নর্ম, মূল্যবোধ এবং সেই মানদণ্ডগুলোকেও প্রভাবিত করে, যেগুলোর ভিত্তিতে মানুষ তার আচরণ নির্ধারণ করে।
পশ্চিমা মিডিয়া ও মুক্তিদাতার ধারণার পরিবর্তন
১৯৯০ সাল থেকে পশ্চিমা চলচ্চিত্র জগৎ, বিশেষ করে হলিউড, ধীরে ধীরে কিন্তু স্পষ্টভাবে তাদের অধিকাংশ প্রযোজনার বিষয়বস্তুকে “মুক্তিদাতা-কেন্দ্রিক” এবং “শেষ যুগ (Apocalyptic)” থিমের দিকে পরিবর্তন করেছে।
নারীরা মানবতার একমাত্র বেঁচে থাকা অংশ
হলিউডের নির্মাতারা শেষ যুগকে চিত্রায়িত করার জন্য বিভিন্ন ধরনের ঘটনা ও কল্পকাহিনি ব্যবহার করেছেন এবং প্রতিনিয়ত নতুন নতুন বিষয় যুক্ত করছেন।
যেমন—বন্যা, ভূমিকম্প, বরফযুগ, শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত সংকট, সৌর বিকিরণ, প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, পারমাণবিক বোমা, আর্থিক সংকট, ভিনগ্রহের প্রাণী, মানব প্রজনন সংকটসহ আরও অসংখ্য ঘটনা—যেগুলো তাদের চলচ্চিত্রে পৃথিবী ধ্বংসের কারণ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।
তবে এর মাঝেও কিছু অদ্ভুত ও ব্যতিক্রমী ধারণা শেষ যুগের কাহিনিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সিরিজ The Last Man-এ দেখা যায়, এক রহস্যময় রোগের কারণে পৃথিবীর সব পুরুষ—মাত্র একজন ছাড়া—মারা যায়, ফলে নারীরাই মানবজাতির একমাত্র বেঁচে থাকা অংশ হিসেবে থেকে যায় এবং তারা সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটের সম্মুখীন হয়।
যদিও বাহ্যিকভাবে এসব চলচ্চিত্র বিনোদনের উদ্দেশ্যে নির্মিত বলে মনে হয়, কিন্তু এর পেছনে থাকা চিন্তাধারা ও মতাদর্শকে উপেক্ষা করা যায় না।
শেষ যুগ থেকে মুক্তির উপায়: মানবিক জ্ঞান ও প্রযুক্তি
হলিউড সিনেমায় শেষ যুগের বিপর্যয় থেকে মুক্তির জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ থিম হলো—মানবিক অর্জন ও প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা।
সিরিজ “Fallout”, যা ২০২৪ সালের একটি পোস্ট-অ্যাপোক্যালিপটিক প্রযোজনা, সেখানে পারমাণবিক যুদ্ধের পর পৃথিবীর মানুষের জীবনচিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
এই সিরিজে, ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক কোনো সমাধানের উপস্থিতি নেই। বরং এক সুনির্দিষ্ট বার্তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে যে, শেষ যুগের বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাওয়ার একমাত্র উপায় হলো মানবিক জ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি, ঈশ্বরীয় কোনো শক্তি নয়।
পশ্চিমা সিনেমায় মানবতাবাদী (Humanist) মুক্তিদাতা ধারণা
চলচ্চিত্র “Snowpiercer” (২০১৩) পৃথিবী ধ্বংসের পর বেঁচে থাকা মানুষের একটি চলন্ত ট্রেনের গল্প উপস্থাপন করে।
এই ট্রেনে ভয়াবহ শ্রেণিবৈষম্য বিদ্যমান, যা শেষ পর্যন্ত নিম্নশ্রেণির মানুষের বিদ্রোহের দিকে নিয়ে যায়। নেতৃত্ব দেয় এক ব্যক্তি, যার নাম কর্টিস।
এই চরিত্রটি কিছুটা নেতিবাচক অতীত থাকা সত্ত্বেও নিম্নশ্রেণির মানুষের জন্য এক ধরনের “মুক্তিদাতা” হিসেবে আবির্ভূত হয়। তবে তার ভুল সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত ট্রেনের সম্পূর্ণ ধ্বংসের কারণ হয়, এবং মাত্র দুইজন মানুষ বেঁচে থাকে।
এই চলচ্চিত্রে কোনো ঐশী মুক্তিদাতার অস্তিত্ব নেই; বরং পুরোপুরি মানবিক, পার্থিব ও সীমিত ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল এক “মুক্তিদাতা”-চিত্র দেখা যায়। এটি মূলত পশ্চিমা সিনেমার মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন, যেখানে মুক্তিদাতা সম্পূর্ণরূপে পার্থিব ও মানবিক।
পরিবার—বিশ্বের একমাত্র মুক্তির শক্তি
অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র “The Mitchells vs. The Machines”-এ মিচেল পরিবারকে কেন্দ্র করে গল্পটি উপস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে তারা এক ভ্রমণের সময় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবট বিদ্রোহের মুখোমুখি হয়।
এই চলচ্চিত্রে দেখানো হয়েছে যে, আধুনিক প্রযুক্তির অতিনির্ভরতা মানবজাতির জন্য বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। তবে এর মাঝেও একটি বার্তা স্পষ্টভাবে উঠে আসে—“পরিবারই প্রকৃত মুক্তির শক্তি।”
মিচেল পরিবার—একটি সাধারণ আমেরিকান পরিবার, যারা ফোর্ড গাড়িতে ভ্রমণ করে—তাদের পারস্পরিক ভালোবাসা ও ঐক্যের মাধ্যমে প্রমাণ করে যে, পারিবারিক বন্ধনই শেষ পর্যন্ত মানবজাতিকে রক্ষা করতে পারে।
তবে অন্যান্য হলিউড প্রযোজনার মতো এখানেও কোনো ঐশী বা আধ্যাত্মিক মুক্তিদাতার ধারণা নেই; বরং সবকিছুই মানবিক ও পার্থিব সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল।
শেষ যুগের সমাজচিত্র (১): গোত্রভিত্তিক সমাজ
হলিউডের অধিকাংশ পোস্ট-অ্যাপোক্যালিপটিক প্রযোজনায় দেখা যায়, শেষ যুগের পর মানবজাতি আবার আদিম ও গোত্রভিত্তিক জীবনে ফিরে যায়।
সিরিজ “SEE”-এ এমন এক পৃথিবী দেখানো হয়েছে, যেখানে মানুষ দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত হয়ে বসবাস করে এবং নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত থাকে।
শেষ যুগের সমাজচিত্র (২): শ্রেণিবৈষম্যপূর্ণ সমাজ
সিরিজ “Silo”-এ মানুষ ভূগর্ভস্থ সিলোতে বসবাস করে, কারণ পৃথিবীর বাইরে বসবাস অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
এই সমাজে কঠোর শ্রেণিবৈষম্য বিদ্যমান—
উপরের স্তরে প্রশাসক ও ক্ষমতাসীন শ্রেণি বসবাস করে, আর নিচের স্তরে শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষ কঠোর পরিশ্রমের মধ্যে জীবন কাটায়।
এই ধরনের শ্রেণিবৈষম্য শুধু “Silo”-তেই নয়, বরং “Snowpiercer”সহ অন্যান্য অনেক পোস্ট-অ্যাপোক্যালিপটিক প্রযোজনাতেও স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
শেষ যুগের সমাজচিত্র (৩): ভয়, আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা
হলিউডের প্রায় সব পোস্ট-অ্যাপোক্যালিপটিক চলচ্চিত্রে মানুষের জীবনকে ভয়, আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার পরিবেশে চিত্রিত করা হয়।
মানুষ সবসময় অতীত বিপর্যয়ের অবশিষ্ট ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করে এবং ভবিষ্যতের ভয়াবহতা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকে।
চলচ্চিত্র “Finch”-এ দেখা যায়, এক ব্যক্তি তার কুকুর ও একটি রোবটের সঙ্গে ধ্বংসপ্রাপ্ত পৃথিবীতে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে, যেখানে প্রতিনিয়ত বিপদের আশঙ্কা রয়েছে।
এর বিপরীতে ইসলাম ভবিষ্যতের একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র উপস্থাপন করে—যেখানে ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর শাসনকালে সমগ্র মানবজাতি ন্যায়বিচার, নিরাপত্তা ও শান্তির মধ্যে জীবনযাপন করবে।
মুক্তিদাতা ধারণার রূপান্তর: একক থেকে সমষ্টিগত
পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গিতে শেষ যুগের বিপর্যয়ের মোকাবিলা সাধারণত মানবিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল, যার ফলে “একক মুক্তিদাতা” ধারণা ধীরে ধীরে “সমষ্টিগত মুক্তিদাতা” ধারণায় রূপান্তরিত হয়েছে।
আগে যেখানে একক নায়ক (যেমন Matrix-এর Neo) বিশ্বকে রক্ষা করত, এখন মার্ভেল ইউনিভার্সসহ আধুনিক সিনেমায় একাধিক নায়ক একসাথে কাজ করে পৃথিবীকে রক্ষা করে।
এই পরিবর্তন দেখায় যে, পশ্চিমা সিনেমায় মুক্তিদাতার ধারণা এখন ব্যক্তিকেন্দ্রিক থেকে দলগত কাঠামোয় রূপ নিয়েছে।
আজকের হলিউড: দ্বন্দ্ব ও বিভক্তি
আধুনিক হলিউড সবসময় একমুখী নয়। বরং এটি এখন দ্বিমুখী প্রবণতার মধ্যে অবস্থান করছে।
একদিকে এখনো মানবিক নায়ক ও মুক্তিদাতার ধারণা প্রচার করা হচ্ছে, অন্যদিকে কিছু চলচ্চিত্রে এই ধারণাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে।
কিছু চলচ্চিত্রে নায়ক ব্যর্থ হয়, কোথাও নায়ক নিজেই বিপদের উৎস হয়ে ওঠে, আবার কোথাও সম্পূর্ণ ধ্বংস ছাড়া কোনো মুক্তি থাকে না।
এই দ্বন্দ্ব পশ্চিমা সমাজের গভীর আস্থাহীনতা ও মূল্যবোধগত সংকটের প্রতিফলন।
পশ্চিমা মিডিয়া একদিকে মানবকেন্দ্রিক মুক্তিদাতার ধারণা তৈরি করছে, অন্যদিকে সেই ধারণাকেই ধীরে ধীরে ভেঙে দিচ্ছে। ফলে আধুনিক মানুষ একদিকে মুক্তিদাতার সন্ধান করছে, অন্যদিকে মুক্তিদাতার ওপর আস্থা হারাচ্ছে।
অন্যদিকে ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গিতে মুক্তিদাতার ধারণা একটি নিশ্চিত, ঐশী ও ন্যায়ভিত্তিক বাস্তবতা, যা মানবজাতিকে চূড়ান্ত শান্তি ও মুক্তির দিকে নিয়ে যাবে।
এই আলোচনা অব্যাহত থাকবে...
সূত্র: কোমের হাওযা ইলমিয়ার মাহদাভিয়াত বিশেষায়িত কেন্দ্র (পশ্চিমা বিশ্ব ও মাহদাভিয়াত বিভাগ)— সামান্য সম্পাদিত ও অনূদিত
আপনার কমেন্ট